অর্ধমৃত জগতে

  • 161
    Shares

লেখক : গোলাম মোস্তফা

 

নিজেকে আজকাল অর্ধমৃত মনে হয় রাকিবের। কি যে দিনকাল যাচ্ছে। সময়টা সত্যি সত্যি ভাল যাচ্ছে না। বেকার বসে আছে। এতদিন ধরে রাকিব টিউশনি করে কিছু টাকা জমিয়েছিল। এখন সেগুলো খরচ হচ্ছে। আস্তে আস্তে শেষ হচ্ছে।

চারিদিকে শুধু তফাৎ আর তফাৎ। জন্মগ্রহণ থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত এই তফাত যাত্রা বহমান। কেবল মানুষ মারা গেলে কোনো তফাৎ নেই। সবাইকেই সাদা কাপড়ে মোড়ানো হয়। রাকিব সারাটা বিকেল বসে বসে এসবই ভাবছে।
সে ভাবছে- প্রতিটি শিশুর বেড়া উঠার পেছনে কত পার্থক্য। কেউ বেড়ে ওঠে শান শওকতে। আর কেউ বেড়ে ওঠে নুন আনতে পানতা ফুরোয় এমন বাড়িতে।প্রতিটি শিশু তো সমান সূযোগ নিয়ে বড় হয়না। তাহলে সমান কর্মফলও তো আশা করা যায় না। রাকিব বসে বসে এসবই ভাবছে। দিনগুলো তার খুবই খারাপ যাচ্ছে।

মানুসিক অশান্তিতে আছে। কাছের কেউ নেই। এককথায় কথা শোনার মানুষ নেই রাকিবের। দুএকজন যারা আগ বাড়িয়ে রাকিবের কথা শুনতে চায় রাকিব তাদের কাছে তার সব কথা বলতে পারে না। কেনোনা তার জীবনে কেবলই লেগে আছে অভাব অভিযোগ পাওয়া না-পাওয়ার গল্প। এসব গল্পের কোনো শেষ নেই। কয়দিনই বা এগুলো মানুষের সাথে শেয়ার করা যায়। বরং এগুলো শুনে শুনে কেউ বিরক্ত হতে পারে সেই ভয়েই রাকিব নিজের ভেতরে সবকিছু চেপে রাখে।কাউকে কিছু বলে না। কেনোনা তার জীবনের নিত্য দিনের গল্পগুলো বড়ই যন্ত্রণার। এগল্প শুনে কেউ সহানুভূতি জানাক রাকিব এটা চায় না। সে কারো করুণা চায় না।

ইদানীং রাকিবের জীবনে একটা ব্যাপার ঘটেছে। সে বন্ধুবান্ধবের সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছে। সে লক্ষ্য করছে দিব্যি তার বড়লোক বন্ধুরা যোগসাজশ করে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাকে কেউ বলছেও না। বলবেই বা কি করে সেই তো নিজেকে আড়াল করে রেখেছে।
না রেখে কি উপায় আছে রাকিবের জীবনে। বাড়িতে রাকিবের মা প্রায় সবসময়ই অসুস্থ থাকে। কোনো মেহমান আসলে তাকেই সবকিছু করতে হয়। সেকারণেই সে আরো নিজেকে আড়াল করে রাখে। নিজের গরীবী অবস্থা নিয়ে কেউ তাকে করুণা করুক, সহানুভূতি জানাক এটা রাকিব চায় না। তার কাছে এগুলো বড্ড অপমানজনক মনে হয়।
আজকাল বড় একা সময় পার করছে রাকিব। অন্ধকার বৃষ্টিভেজা রাতকে রাকিবের বড্ড আপন মনে হয়। কতদিন রাকিব মাঝরাতে কেঁদে ওঠে। উঠোনের পাশের আমগাছটার নিচে গিয়ে মাঝরাতে বসে থাকে। কত কি চিন্তা করে।

এই যেমন গতকাল রাতে সে অনেককিছু ভেবেছে। সেগুলো ডায়রিতে লিখে রেখেছে। তার কয়েকটা পাতা আমাকে ফেসবুকের মেসেনজারে পাঠিয়েছে।
লিখেছে…. “জীবন সমান্তরালে চলে না। জীবনের কত বৈচিত্র্য। একেকজন মানুষের জীবন একেক রকম। কত আফসোস জীবনে। একজীবনে সবার সব আশা পূরণ হয়না। তবে মদনুষের আশার কোনো শেষ নেই। এই যেমন গরীব মানুষেরা বড়লোক হতে চায়। সেকারণে দেখবেন বড় বড় মোটিভেশনাল স্পিকারেরা কেবল গীরবদেরকেই মোটিভেশন দেয়। তাদের সব মোটিভেশনাল স্পিচ গরীবদের জন্য। এটা ক্ষেত্র বিশেষ কাজও করে। কেনোনা এই মোটিভেশন নিয়েই গরীবের মেধাবী ছেলেমেয়েরা ধুমছিয়ে পড়ালেখা করে ফাটাফাটি রেজাল্ট করে। তারপর চাকরির বই মুখস্থ করে ব্যাংক – অফিস – আদালতে চাকরি নেয়। দায়িত্ব গ্রহণ করে বড় লোকদের জানমাল নিরাপত্তা দেয়ার। কেউ বা ব্যাংকে বড়লোকের টাকার হিসেব রাখতে রাখতে জীবন পার করে দেয়। কেউ বা প্রাইমারি, হাইস্কুল, কলেজে শিক্ষকতা করে। বোর্ডে বই পড়ায়৷ সুদের অংক শেখায়। একদিন এর ভেতর থেকে কেউ কেউ বড় বড় সুদখোর হয়ে ওঠে। এর ভেতর থেকে কেউ কেউ মিডিয়ার নজরে আসার জন্য শীতের মৌসুমে কম্বল বিতরণ করে। অনেকটা খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি – এরকম করে।
এতটুকুই আমি রাকিবের মেসেনজারে পাঠানো ডায়রির অংশ থেকে পড়লাম। পড়ার পর আমি কোনো রিপ্লাই দিই নি। কেনোনা রাকিবের লেখার শিরোনাম ছিল “অর্ধমৃত জগতে”।

আমি জানি রাকিবের এই লেখা পড়ে যদি আমি কোনো সহানুভূতি জানাতে চেষ্টা করি তাহলে সে ভাববে আমি তাকে করুণা করছি। তাই আমি কিছুই বলিনি।

লেখক- প্রতিষ্ঠাতা এবং পরিচালক, বিইপিএস

 

বাংলা প্রবাহ ২৪ / এএ ডি

শর্টলিংকঃ