করোনাকালে একাত্তর পেরিয়ে আওয়ামী লীগ আর একটাই প্রত্যাশা

  • 2
    Shares

আজ আওয়ামী লীগের একাত্তরতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। একাত্তরে স্বাধীন এই দেশটার স্বাধীনতার প্রতিটি ইট পাথরের গাঁথুনিতে খোদাই করা আওয়ামী লীগের নাম। একজন বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে আর তিনি এই দলটির হাল না ধরলে ইতিহাস আজকের বর্তমানকে কোথায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাত জানি না, তবে এতটুকু জানি, বাংলাদেশ নামে আজকের এই যে দেশটি দক্ষিণ এশিয়ায় এক লাখ পঞ্চান্ন হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে সগৌরবে প্রতিনিয়ত নিজের স্বাধীন অস্তিত্ব ঘোষণা করে চলেছে, তার জন্ম হতো না।

এটি হতে পারত পাকিস্তানের কোনো কলোনি, অবাক হতাম না যদি এটি আজও ভারতের কোনো প্রদেশ হিসেবে রয়ে যেত। আবার ইদানীং যা মনে হচ্ছে একটি বিতর্কিত ভূখণ্ড নিয়ে প্রতিবেশী দুই বড় দেশের রেষারেষির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারতাম হয়তো আমরা। কিন্তু সে রকম কিছুই হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে একাত্তরে।

আর এটি সম্ভব হয়েছে শুধু একজন ব্যক্তির প্রজ্ঞা আর নেতৃত্বে তিনি বঙ্গবন্ধু। আর এই স্বপ্নকে স্বপ্নের জায়গা থেকে মানচিত্রে নামিয়ে আনায় বঙ্গবন্ধুর পেছনে ছিল যে রাজনৈতিক সংগঠনটি তার নাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সেই আওয়ামী লীগের আজ একাত্তর বছর। নানা কারণে আওয়ামী লীগের এবারের এই জন্মদিনটি আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এবার একাত্তর পেরিয়ে বাহাত্তরে পা দিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই একাত্তরে যে দেশটির জন্ম, সে দেশটির শাসন ক্ষমতায় আজ আওয়ামী লীগ এবং সেই আওয়ামী লীগের আজ একাত্তর বছর। এটি হলো সংখ্যাতাত্ত্বিক আবেগের জায়গা। তবে তার চেয়ে যে বড় কারণ, তা হলো আজ অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক এমন একটি প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের জন্মদিনটি উদযাপিত হতে যাচ্ছে যা অভূতপূর্ব।

পুরো পৃথিবী এখন কোভিড-১৯ জ্বরে আক্রান্ত। পৃথিবীতে প্রায় ৯১ লাখ আর বাংলাদেশে সোয়া লাখ মানুষ কোভিড-১৯ আক্রান্ত। এদের মধ্যে আমিও একজন। এ দীর্ঘ তালিকায় আছে আমার স্ত্রী ডা. নুজহাত চৌধুরী আর আমাদের একমাত্র ছেলে সূর্যের নামও।

এই কোভিডকে যতভাবে এবং যত কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে, অনেকেরই তা হয়নি। এদেশে একদম শুরুর দিকে কোভিড-১৯ নিয়ে যে প্রথম বৈজ্ঞানিক সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয় সেটি আমিই আয়োজন করেছিলাম ৮ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে মূল প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেছিলেন জাপানের এহিমে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত জাপান প্রবাসী বাংলাদেশি লিভার বিশেষজ্ঞ ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর। তারপর থেকে ডাক্তারি, লেখালেখি আর মিডিয়ায় বলাবলি যখন যেভাবে পেরেছি সব জায়গায় সংযুক্ত থাকার চেষ্টা করেছি এবং এখনতো আমি নিজেই একজন কোভিড রোগী।

কোভিড-১৯ ব্যবস্থাপনায় যা কিছু সাফল্য, তার সুবিধাভোগী যেমন আমি, তেমনি যা কিছু ব্যর্থতা তার ভুক্তভোগীও আমি কম নই। তবে আমি কৃতজ্ঞ স্রষ্টার কাছে কারণ এই দুর্যোগ মুহূর্তে দেশের ক্ষমতায় আছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। করোনা মোকাবিলায় যেটুকু সুবিধা আমি ভোগ করেছি তার কিছুই আমি ভোগ করতে পারতাম না যদি আজ থেকে ১২টি বছর আগে এদেশে করোনা হানা দিত, আর যা কিছু দুর্ভোগ আমি ভোগ করছি আওয়ামী লীগ এদেশে ক্ষমতায় থাকা স্বত্ত্বেও, তা শতগুণে বেড়ে যেত যদি আজ আওয়ামী লীগ এদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় না থাকত।

তারপরও একটু আক্ষেপ। আমি সবাইকে বলি করোনা মোকাবিলাটি হচ্ছে গাড়ি চালানোর মতো। খালি নিজে ভালোমতো গাড়ি চালালে হবে না, আশপাশের সবাইকেও ঠিকমতো গাড়িটা চালাতে হবে। আমি নিজে কোভিড-১৯ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এবং এক পর্যায়ে আক্রান্ত হয়ে বুঝতে পেরেছি, আমার আশপাশের যারা আছেন, তারা সবাই যদি সচেতন না হন তবে আমি যতই সচেতন হই না কেন, কোভিড-১৯ থেকে আমার মুক্তি নেই।

আমার কেন যেন মনে হয়, করোনা মোকাবিলায় আমাদের যে সাফল্য তা আরও বড় হতে পারত, যা কিছু ব্যর্থটা মুছে যেতে পারত যদি না আওয়ামী লীগ আরেকটু উদ্যোগী হতো, আরেকটু সতর্ক হতো। সাড়ে ১১টি বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগে যে কিছুটা উদাসীনতা এসেছে, সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই এবং আমার কেন যেন মনে হয় সেই সুযোগে ‘বড় আপার’ এত সব উদ্যোগের যে এত সব সুফল, তার সবকিছু সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় না পৌঁছে, কিছু কিছু ইঁদুরের পেটে চলে যায়। আওয়ামী লীগের এই উদাসীনতার সুযোগে ইঁদুরগুলো সিঁধ কেটে ঢুকে পড়েছে আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন কমিটি থেকে শুরু করে এমনকি আমাদের স্বাস্থ্য অধিদফতরের মতো বড় বড় জায়গায়ও।

আমাদের প্রত্যাশা এখন একটাই- আওয়ামী লীগ একটু গা-ঝাড়া দিক, একটু সচেতন হোক। সাম্প্রতিককালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের একটি ভিডিওবার্তা আমাকে অন্তত দারুণভাবে আশান্বিত করেছে। একজন কোভিড রোগী হিসেবে তার ভিডিওবার্তায় আমি এতটাই আশান্বিত হয়েছি যে একজন কোভিড রোগীর অন্তরের অন্তঃস্থলের সবটুকু ভালোবাসা পৌঁছে গেছে এই তার জন্য।

আমি প্রত্যাশা করব- আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের এই যে ঘোষণা, এটি অনুরণিত হবে আওয়ামী লীগের প্রতিটি পর্যায়ে, প্রতিটি স্তরে। আর তাই-ই যদি হয়, আজ থেকে আরও একাত্তরটি বছর পর যখন আমি থাকব না, কিন্তু আমি নিশ্চিত তখন আমার সূর্য আওয়ামী লীগের একশ বিয়াল্লিশতম বার্ষিকীতে পৃথিবীর প্রাচীনতম দলটিকে শাসন ক্ষমতায় দেখতে পাবে। করোনাকালে একাত্তর বছরে যখন আওয়ামী লীগ, দলটির কাছে প্রত্যাশা আমার একটাই- একটু গা-টা ঝাড়া দিন।

লেখক: অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল), চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।
সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।
অর্থ সম্পাদক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

বাংলা প্রবাহ /এন এ

শর্টলিংকঃ